হাসিনা ক্ষমতায় এসেই জিজ্ঞাসা করেছিলো তার সামরিক এডভাইজারদেরকে - রিস্ক কি কি

 হাসিনা ক্ষমতায় এসেই জিজ্ঞাসা করেছিলো তার সামরিক এডভাইজারদেরকে "রিস্ক কি কি? কোন দিক থেকে আমাকে ফেলে দিতে পারে?"

তারা বলেছিলো : পুলিশ কনট্রোলে, মিলিটারি কনট্রোলে, বিরোধি দল কনট্রোলে ... সরকারি কর্মচারি, বিশ্ববিদ্যালয়, শিবির, বিএনপি, রাস্তার আন্দোলন, আদালত, প্রেসিডেন্ট, সংসদ, চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশন, মাদ্রাসা ... সব আমাদের কনট্রোলে। নির্বাচনে আপনি যাই করেন না কেন। এদিক থেকে বিপদ নেই।

আপনার পতন কেবল একভাবেই হতে পারে : যদি দেশের সমস্ত জনগন মিলে রাস্তায় নেমে আসে। তখন ঠেকানো যাবে না।

——

উপরেরগুলো শুনেছিলাম ১০ বছর আগে।

এজন্য যে কোনো সামান্য আন্দোলন বা সমালোচনা যেটা মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে, সেগুলো কঠিন হাতে দমন করতো। প্রয়োজনের থেকে ১০ গুন ফোর্স দিয়ে। নিষ্ঠুর ভাবে।

শেষ রক্ষা হয়নি। একমাত্র যে ভাবে পতন হতে পারে বলেছিলো, এক্সাক্টলি সেভাবেই পতন হয়েছে। // 

ডক্টর ইউনুস যেভাবে মাহফুজ আলমকে পরিচয় করিয়ে দিলেন মাস্টারমাইন্ড হিসেবে। এটা মেনে নেয়া যায় না। 

আন্দোলনের বয়ান চুরি সহ্য করা হবে না। ৭ই অগাস্টে আসিফ আদনান সত্য ঘটনাপ্রবাহ সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিল। এটাকে অস্বীকার করে অন্য কিছু বসানো যাবে না। 

// হাসিনা পতনের যে আন্দোলন তার বাস্তবতা আমাদের মনে রাখা দরকার, এবং বারবার মনে করিয়ে দেয়া জরুরী। তা না হলে বিভিন্ন বয়ান তৈরি করে সেগুলো দিয়ে অনেক কিছু জাস্টিফাই করা হবে। 

.

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে: 

.

এটা কোন নির্দিষ্ট আদর্শ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না। কোন নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় আনার আন্দোলন ছিল না। কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের প্রধান বানানোর আন্দোলন ছিল না। 

. 

এটা ছিল একটা পিওরলি রিয়্যাকশানারি বা প্রতিক্রিয়ামূলক আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রধান তিনটা স্লোগান লক্ষ্য করুন-

.

তুমি কে, আমি কে - রাজাকার রাজাকার

.

ভুয়া ভুয়া! 

.

ছি ছি হাসিনা, লজ্জায় বাচি না।

.

একটা পিওর রিয়্যাকশান, একটা পিওর রেইজ, আর শেষেরটা নিরেট হাসিনা বিরোধিতা। 

.

এই আন্দোলনকে মানুষ যোগ দিয়েছে দুটো কারণে - 

.

প্রথমে, আবু সাইদ-মুগ্ধদের খুনের প্রতিবাদে 

তারপর, আওয়ামী জাহিলিয়াতের পতনের লক্ষ্যে

.

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক আন্দোলন ১৬ তারিখেই থিতিয়ে যেতে পারতো। খুনী পুলিশের সহায়তায় এই রাতে পাবলিক ইউনিগুলোর দখল নিয়ে ফেলে ছাত্রলীগ। হল বন্ধ করে দেয়। আন্দোলনকারী এবং সমন্বয়কদেরও বের করে দেয় ক্যাম্পাস থেকে।

.

পরের দুইদিন আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যায় প্রাইভেট ইউনি, কলেজ এবং স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। প্রাইভেট ইউনির ছাত্ররা বিসিএস দিতে আগ্রহী না। তাদেরকে আন্দোলনে নামতেও আহ্বান করা হয়নি। তবু তারা রাস্তায় নেমে যায় আবু সাইদসহ নিহত ও আহত পাবলিক ইউনির ছাত্রছাত্রীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে। 

.

এ দুইদিনে নিহতদের বড় একটা অংশ ছিল ঢাকার আরবান মিডল এবং আপার-মিডল ক্লাসের সন্তান। এসময়টাতেই শহুরে মিডল ক্লাসের বিশাল অংশ হাসিনার বিরুদ্ধে চলে যায়। মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায়, বাংলাদেশ একটা অদৃশ্য লাইন অতিক্রম করে ফেলেছে। যা হয়েছে, তারপর সব কিছু আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে না। 

.

এই সময়টাতে এবং ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় আন্দোলনে কী-রোল প্লে করে ঢাকা এবং পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকার ছিন্নমূল মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত হলেও, তাদেরকে মোবালাইয করার ক্ষেত্রে প্রায় নিশ্চিতভবেই বিএনপি এবং জামআতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল। এই শ্রেনীরও কোটা নিয়ে মাথাব্যাথা ছিল না। 

.

আন্দোলনের শেষ দিকে কওমী মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ইসলামী দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল রাজপথে, তারাও কেউ কোটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। 

.

ইন্টারনেট ফেরার পর প্রথম ৩-৪ দিন ফেইসবুকে মানুষ খুব ভয়ে ভয়ে কথা বলছিল। এই সময়ে বিভিন্ন ঘরানার যেসব ফেইসবুক আইডি আন্দোলনের পক্ষে জনমত তৈরি করেছে, ভয় ভেঙ্গে মানুষকে কথা বলতে উৎসাহিত করেছে, তাদের অ্যাটলিস্ট ৯০% এর কাছে কোটার কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই। 

.

বাস্তবতা হল হাসিনার পতনের যে আন্দোলন তার, 

- প্রধান উসকানিদাতা হাসিনা 

- প্রধান সমন্বয়ক হাসিনা 

- প্রধান স্থপতি হাসিনা 

.

হাসিনার লাগামছাড়া বক্তব্য, তার চরম ঔদ্ধত্য এবং তার ক্রমাগত মিসস্টেপ পুরো দেশের মানুষকে, দেশের সবচেয়ে অ্যাপলিটিকাল, নির্বিবাদী অংশকেও হাসিনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে। 

.

জুলাইয়ের ২ তারিখ থেকে শুরু করে অগাস্টের ২ তারিখ পর্যন্ত যে কোন সময় দাবি মেনে নিয়ে হাসিনা এই আন্দোলন বন্ধ করে দিতে পারতো। কিন্তু তা না করে, সে বারবার মানুষ খুন করে, তার দম্ভ এবং ১৫ বছরের আওয়ামী জাহিলিয়াতের মাধ্যমে সবাইকে তার বিরুদ্ধে এক কাতারে নিয়ে আসে।  

.

.

এই বাস্তবতাগুলো আমাদের মনে রাখা জরুরী। 

.

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হাসিনার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে সত্য। কিন্তু মানুষ কীসের জন্য তাদের নেতৃত্ব মেনেছে? কোন বিষয়ে তাদের নেতা মেনেছে? 

.

কোটার জন্য? ইউনুসকে ৬ বছরের জন্য সরকার প্রধান বানানোর জন্য? তারা পছন্দমতো নানা সংস্কার করবে, তারপর বলবে জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন স্বরূপ জনগণের পক্ষ হয়ে আমরা এগুলো করেছি - তার জন্যে?

.

না। 

.

মানুষ তাদের নেতৃত্ব মেনেছে হাসিনার পতনের জন্য। সোজাসাপ্টা কথা। কোন সৎ এবং বিবেকবান মানুষ এই সত্যকে অস্বীকার করবে না। 

.

ছাত্রনেতাদের কৃতিত্ব ও ত্যাগ কেউ অস্বীকার করে না। তারা নির্যাতিত হয়ে বক্তব্য বদলাননি (গুটিকয়েক ছাড়া), তারা বুদ্ধিমত্তার সাথে কর্মসূচী দিয়েছেন, আন্দোলনের গতি ধরে রেখেছেন - এই সব ক্রেডিট তাদের দেয়া যায় নির্দ্বিধায়।

.

কিন্তু কোন নির্দিষ্ট আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য জাতি তাদের নেতা বানায়নি। তাদের এমন কোন ইশতেহার কিংবা ম্যানিফেস্টো ছিল না, যা জনগণ দেখেছে, বুঝেছে এবং সেটায় সমর্থন দিয়েছে। 

.

মানুষ রাস্তায় নেমেছে কেবল, এবং কেবলই নিহত ও আহতদের সাথে সংহতি প্রকাশ, গণহত্যার বিচার এবং আওয়ামী জাহিলিয়াতের পতনের উদ্দেশ্য।  //


https://www.facebook.com/
sharif.abu.hayat/posts/pfbid08Fg6exi5yotupFHkzen2ZxvKZKsyriEvodtfSAmSznoNKr5czdb6nnAqJVdNWfLSl


ট্যাগঃ

আন্দোলনের ইতিহাস 

Comments