আবরার ফাহাদ ছিলো আমাদের জন্য একটা প্যারামিটার।

 এই দিনের আগ পর্যন্ত আমি আওয়ামীলীগকে মানুষ মনে করতাম। 

বাট আবরারকে মারার পর থেকে আমি আওয়ামীলীগকে আর মানুষ মনে করি না। 

না, তারমানে এই না যে আওয়ামীলীগ আগে ভালো ছিলো। জাস্ট আওয়ামীলীগ যে কতটা খারাপ, ঐটা আবরার ফাহাদ আমাকে দেখাইয়া গেছিলো। 

এবং এই দিনের পর থেকে যারা আওয়ামীলীগ সমর্থন করে, তাদেরকেও আমি মানুষ মনে করি না। মানসিকভাবে বিকৃত মানুষ মনে করি।

আবরার আমাদের জন্য ছিলো একটা ধাক্কা। একটা বজ্রপাত। 

আবরারের মৃত্যুই আমাদের প্রথমবারের মতো মনে করাইছিলো, আওয়ামীলীগের হাতে আমরা কতটা অনিরাপদ। জাস্ট সন্দেহ হলেই আওয়ামীলীগ আমাদের ডেকে নিয়ে মেরে ফেলতে পারবে। 

আবরারই প্রথমবারের মতো আমাকে বুঝাইছিলো, পতাকা বা সংবিধান আপনাকে স্বাধীনতা দেয় না। স্বাধীনতা দেয় শাসক। 

আবরারই আমাকে প্রথম বুঝাইয়া গেল, পিন্ডির থেকে স্বাধীন হলেও আমরা এখনও দিল্লীর থেকে স্বাধীন হইনি। শেখ মুজিব পাকিস্তানে বসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েও বেঁচে থাকতে পেরেছিলো, কিন্তু আবরার ফেনী নদীর পানি চেয়ে আর বেচে থাকতে পারলো না। 

আমি বুঝেছিলাম, ছাত্রলীগ কী ভয়ঙ্কর একটা সংগঠন। আমি বুঝেছিলাম, হাসিনা আইয়ুব খানের চেয়েও জঘন্য শাসক। 

আবরারের মৃত্যুর পর ছাত্রলীগের প্রতিটা মিছিল দেখার পর আমার গায়ে ঘিনঘিনে একটা অনুভূতি হয়েছে। ছাত্রলীগকে ততদিনে আমি অপছন্দ না, ঘৃণা করতে শিখে গেছি। 

আবরার হত্যার পর থেকে আর কোন আওয়ামীলীগ সমর্থকের সাথে আমি স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারিনি। আমার বারবার মনে হয়েছে, এরা এমন একটা দল করে, যারা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে পিটিয়ে একটা ছেলেকে মেরে ফ্যালে। 

আবরার ফাহাদ আমাকে খালেদা জিয়ার একটা বক্তব্যের মর্ম বুঝিয়েছিলো। 

খালেদা জিয়া একবার আওয়ামীলীগের সাথে তুলনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ওদের হাতে আছে গোলামির জিঞ্জির,আর আমাদের হাতে আছে স্বাধীনতার পতাকা। 

বক্তব্যটাকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখে আসলেও আবরার ফাহাদের মৃত্যুর পর মনে হয়েছিলো, এই গোলামের দল ক্ষমতায় না থাকলে কি আবরার ফাহাদকে এভাবে জীবন দিতে হতো? 

হাসিনার রাজনীতি যে আদতে নাজি বাহিনীর হিটলারি রাজনীতি, ঐটা আমি প্রথম বুঝেছিলাম আবরার ফাহাদের মৃত্যুর পর।

এই একটা মৃত্যুই আমার রাজনৈতিক পরিচয় ঠিক করে দিয়েছিলো। 

আমি ওয়াদা করেছিলাম, আওয়ামীলীগের মতো নোংরা একটা দলের বিরুদ্ধে লড়াইই হবে আমাদের লক্ষ্য। আওয়ামীলীগ আর সুস্থ মানুষের পাশাপাশি অবস্থান অসম্ভব।

আবরার ফাহাদ নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে আমাদের অনেকের দেহে রাজনৈতিক প্রাণ সঞ্চার করে গেছেন। আমাদের জাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। 

৫২ র ভাষা আন্দোলন যেমন ৭১ এর ভিত গড়ে দিয়েছিলো, ১৯ এর আবরারও তাই। 

পাকিস্তান সরকার যেমন শহিদ মিনার ভেঙে দিতো, হাসিনার পুলিশ বাহিনীও আবরারের স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে দিয়েছে বারবার। 

কিন্তু আমরা কি আবরারকে ভুলেছি? 

না, ভুলিনি। 

ভুলবোও না কোনদিন। 

আমাকে অনেকেই বলেন, রাজনীতি শিখতে হলে কোন বই পড়বো। কীভাবে ঠিক ভুল নির্নয় করবো। 

আমি তাদের বলি, বই লাগবে না, আপনি বরং আবরারকে আপনার রাজনৈতিক কম্পাস বানিয়ে নেন। 

ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ আর আওয়ামী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আবরারের চে বড় মহাকাব্য এই পৃথিবীতে আর একটাও নাই, বিশ্বাস করেন। 

লতিফুল ইসলাম শিবলী লিখেছিলেন, 

কন্ঠে তোল বজ্রধ্বনি, 

কলম করো তীক্ষ্ণ ধার, 

শাহাদাতের পথ দেখালো, 

আবরার!!আবরার!!

এই যে জুলাই বিপ্লবে ২০০০ আবু সাঈদ অর ওয়াসিম আকরামরা নিজেদের প্রাণ দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনলো, ঐ শাহাদাতের দুর্গম পথটা শহীদ আবরারের রক্তেই প্রথম লাল হয়েছিলো!! 

ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রথম শহীদ আমাদের ভাই আবরার ফাহাদকে যেন আমরা কোনদিন ভুলে না যাই!!

© সাদিকুর রহমান খান

Comments