১৯৮৯ এর ১৫ আগস্ট ও তারপরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ঘটেছিল?
এটি এখন থেকে প্রায় ৩৫ বছর পূর্বের ঘটনা। ঐদিন দুপুরে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-বেরুনী হলের এক্সটেনশনের একটা রুমে একতরফাভাবে একজন ছাত্রকে পেটানো হয়। রাতে আবার পরিকল্পিত ভাবে একটি ছাত্রসংগঠনকে ক্যাম্পাস থেকে উৎখাতের নিমিত্তে চালানো হয় হামলা। প্রতিরোধে লেগে যায় ছাত্রসংঘর্ষ। আহত হন অনেকে। পরেরদিন পত্রিকায় খবর আসে একজনের মৃত্যুর। কিন্তু সত্যিকার মৃত্যুর ঘটনা ঘটে সংঘর্ষের আরো কয়েকদিন পর ঢাকা মেডিকেলে।
ঘটনাটা হল ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সংঘর্ষের। কুমিল্লায় এক ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে একজন ছাত্র নিহত হয়। এরই প্রেক্ষিতে ছাত্রদল ঢাকা আলিয়া ও অন্যান্য জায়গায় তাণ্ডব চালায় ও কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ১৫ আগস্ট ১৯৮৯ আমাদের প্রথম বর্ষ ফাইনালের আগে সর্বশেষ ক্লাস শেষ করে সালাম-বরকত হলে আমার কামরায় ফিরে আসছিলাম। পথে খবর পেলাম আমাদের ব্যাচমেট ভূগোলের ছাত্র ও শিবিরের সাথী নাদিরকে আল-বেরুনী হলের এক্সটেনশনে তার কামরায় ঢুকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়েছে ছাত্রদলের কিছু ছেলে। এরা নাদিরের পূর্বপরিচিত এবং বন্ধু। নিজের পরীক্ষার পড়া তৈরি নিয়ে ব্যস্ত নাদির এর রুমে এরা আসতে চাইলে তিনি তাদের সাদরেই ভেতরে নিয়ে যান। কিন্তু ভেতরে গিয়েই তারা তাকে পিটিয়ে আহত করে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে দু’টি সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে বসিয়ে মিটমাট করে দিলেন। ছাত্রদলের নেতারা ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে এর পুনরাবৃত্তি না করার ওয়াদা করলে ব্যাপারটা শেষ হয়ে যায়।
প্রকৃতপক্ষে ঘটনা ওখানেই শেষ হয়ে যায়নি। ছাত্রদল ঠিকই পরিকল্পনা করে রাতের বেলা শিবির উৎখাতের। ঐ রাতেই আবার হামলা করা হয় নাদিরের রুমে আল-বেরুনী হলের এক্সটেনশনে। দিনের আহত নাদিরকে আবারও পেটানো হয়। এইরূম থেকে পালিয়ে পেছনের দেয়াল টপকিয়ে আমাদের হলে আসেন ভূগোলের আরেক ছাত্র নাজমুল। শোরগোল শুনে আমরা রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই দেখলাম ছাত্রদলের কবিরসহ বেশ কয়েকজনকে লাঠিসোটা নিয়ে এগিয়ে আসতে। তারা আক্রমন করে বসে শিবিরের কিছু ছেলেদের। সেখানে দুপক্ষের মধ্যে হালকা সংঘর্ষ হলে কবির আহত হয় ও অন্যরা পালিয়ে যায়। পরে আরো সংঘর্ষ ঘটলে সালাম-বরকত ও কামাল উদ্দীন হলের মাঝে রাস্তায় আহত হয়ে পরে থাকেন শিবিরের সদস্য ও রসায়ন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তৌহিদ হোসেন ভাই। আমি এবং আরো একজন ধরাধরি করে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকে নিয়ে গেলাম। একজন মারাত্মক আহত মানুষ যে কত ভারী হয় তখন তা বুঝতে পেরেছিলাম।
ডাক্তাররা যখন তৌহিদ ভাইয়ের চিকিৎসা করছিলেন তখন আমি দেখলাম কবিরকে তার কয়েকজন বন্ধু সহ নিজে হেটে এসে ক্লিনিকে ঢুকতে। তাকে কোনভাবেই মারাত্মক আহত দেখাচ্ছিলনা; এমনকি তার শরীরে মূলতই কোন আঘাতের চিহ্ন ছিলনা। সে মাথায় বাড়ি খেয়েছিল। পরে দেখলাম মাথা একদিকে সামান্য ফুলা।
ডাক্তাররা তৌহীদ ভাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিলেন, আর আমি তাঁদের সহায়তা করছিলাম। এমন সময় দেখলাম বামপন্থী কিছু ছেলে [সম্ভবত ছাত্রফ্রন্টের] একজন মারাত্মক আহত ছাত্রকে ক্লিনিকে নিয়ে আসতে। তাকে মূলত মৃতই মনে হচ্ছিল। চেহারা এত বেশী বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে তাকে চেনা যাচ্ছিল না।
আমি তাড়াতাড়ি তৌহিদ ভাইকে ক্লিনিকের মোটামুটি একটা নিরিবিলি কক্ষে নিয়ে গেলাম ডাক্তারদের সহায়তায়, যাতে তিনি জিঘাংসার শিকার না হন। এরপর আস্তে আস্তে বেরিয়ে এসে দেখতে গেলাম নতুন আহত ছাত্রটিকে। ভাল করে তাকিয়ে দেখি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবির সভাপতি মুমতাজ ভাই। অসংখ্য ছুরিকাঘাতে তাঁর চেহারা বিকৃত হয়ে ফুলে গিয়েছিল। তাঁর থুতনির নীচে গলার দিকের হালকা দাড়ি দেখে তাঁকে চিনতে পারলাম আমি।
তাড়াতাড়ি করে আমি ডাক্তারদের নিয়ে আসলাম। একজন তাকে আইভি ফ্লুইড লাগিয়ে দিয়ে আরেকজন আহত স্থানগুলো সেলাই করতে লেগে গেলেন। তিনি তখনো বেহুঁশ। এই অবস্থায় আসল ছাত্রদলের একদল। এদের একজন হচ্ছে রনি। সে এসেই ডাক্তারের সেলাইরত অবস্থাতেই প্রচণ্ড জোরে একটা ঘুষি বসিয়ে দিয়েছিল মুমতাজ ভাইয়ের পেটে। এত প্রচণ্ড জোরে ঘুষি মারা হয়েছিল যে তাঁর বেহুঁশী কেটে গিয়ে তার পাগুলো ও মাথা সোজা হয়ে উপরে উঠে গিয়েছিল। আমি এদের এই বর্বরতায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। এদিকে আল্লাহ তার বান্দাদের পক্ষে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে এই রনির হাতকে চেপ্টা করে শুইয়ে তার দলেরই আরেক গুণ্ডা গুলি করেছিল কাটা বন্দুক দিয়ে। ফলে তার আঙ্গুলগুলো সোজা হয়ে ছড়িয়ে যায় যা আর সে মুষ্ঠিবদ্ধ করতে পারতোনা।
সেখানে ছাত্রদলের ছেলেরা আমাকেও আক্রমন করে। মুখে একটা প্রচণ্ড ঘুষি খেলে নিচের ঠোঁটটা ফেটে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও ডাক্তাররা আমাকে তাড়াতাড়ি ক্লিনিক চলে গিয়ে আড়াল হতে বলছিলেন। কিন্তু আমি মমতাজ ভাই ও তৌহিদ ভাইকে ক্লিনিকে রেখে কোনভাবেই যেতে চাচ্ছিলাম না। শিক্ষকরা আমাকে বললেন, "দেখো ছেলে, আমরা তোমাকে বাঁচাতে পারবো না। তাড়াতাড়ি এখান থেকে ভাগো। আর আহতদেরকে আমরা ঢাকা মেডিকেলে পাঠাচ্ছি।" শেষ পর্যন্ত মমতাজ ভাই ও তৌহিদ ভাইকে ঢাকাগামী এম্বুলেন্সে তুলে দিয়ে আমি আল-বেরুনী হলের পেছনের খেলার মাঠ দিয়ে পশ্চিম দিকের গ্রামের দিকে রওয়ানা হয়ে গিয়েছিলাম। ওদিকে ছিল আমার রুমমেট মতির বাড়ি। তাদের বাড়িতে গিয়েই উঠলাম।
আহতদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। ঢাকা মেডিকেলেই ছাত্রদল আরেকবার হামলা চালায় আহতদের উপর। নিজেদের দল না কি শিবির বুঝতে না পেরে কবিরকেও তারা মারধর করে। এতে কবিরের মাথার আঘাত আরো বড় হয়ে যায়। পরেরদিন পত্রিকায় খবর বের হয় জাহাঙ্গীর নগরে ছাত্র সংঘর্ষের এবং শিবির সভাপতি মুমতাজ ভাই নিহত হবার।
অন্যদিকে কয়েকদিন ধরে কবিরের মাথার ফোলা না কমলে ডাক্তাররা অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। অপারেশন করতে গিয়েই কবিরের ব্রেনে ইনফেকশন হয়ে যায়। ফলে কয়েকদিন পরে সে মারা যায়। কবিরের ব্রেন ইনফেকশনে নিহত হবার বিষয়টি তার বোন, যিনি নার্স ছিলেন, নিশ্চিত করেছেন। ওদিকে মুমূর্ষ মুমতাজ ভাই বেঁচে যান এবং বেশ কিছুদিন হাস্পাতালে কাটিয়ে সুস্থ্য হয়ে উঠেন পুরোপুরি।
ঘটনার পরে কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেন। ক্যাম্পাসে পুলিস আসে। এরপর ছাত্রদল আমাদের ২০ জন ভাইয়ের তালিকা করে তাদেরকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে এবং ছাত্রদলের সাথে অন্যরাও এতে যোগ দেয়। এ ২০ জনের বাইরে আরো ৪ জন কোন না কোন ভাবে আর ক্যাম্পাসে যেতে পারেন নি। শেষোক্ত ৪ জনের মধ্যে ছিলেন ড. Salman Al-Azami -ও। তিনি আমাদের ব্যাচমেট ছিলেন এবং ইংরেজী বিভাগের ছাত্র ছিলেন।
এই ২৪ ছাত্রের কাউকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহিষ্কার করে নি বা ছাত্রশিবিরকেও কর্তৃপক্ষ নিষিদ্ধ করে নি। ২৪ জনের মধ্যে আমরা যারা ১ম/২য় বর্ষের ছিলাম তারা অনেকেই দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিরাগত পরীক্ষার্থী (প্রাইভেট পরীক্ষার্থী) হিসাবে বিএ পাশ করি এবং/অথবা ভারতে ও মালয়েশিয়ায় পড়তে যাই। যাঁরা ৩য় বর্ষের ছিলেন তাঁদের অনেকই তাঁদের ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের সহযোগিতায় ক্যাম্পাসের আশে পাশে থেকে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে পরে বিদেশে মাস্টার্স/পিএইচ-ডি করেছেন।
আমরা পুনর্বার ক্যাম্পাসে ইচ্ছে করেই যাই নি, কারণ গেলে আরেকটা সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য। এরপর ছাত্র শিবির গোপনে কাজ করতে থাকে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট বি,এ, (পাস) পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণিতে ৩য় হয়েছিলাম। এরপর চলে গেলাম আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ায়।
সে সময় ছাত্রশিবির আরেকবার খোলাখুলি কাজ শুরু করেছিল এবং এর ফলশ্রুতিতে যে সংঘর্ষ হয় (সালটা আমি স্মরণ করতে পারছিনা, তবে সম্ভবত ৯৩ বা ৯৪ হবে, কারণ আমরা তখন মালয়েশিয়ায়) তাতে শিবির তার দুশমনদেরকে সব হল থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কিন্তু আবারো সরকারী বাহিনী (পুলিস) এসে শিবিরকে উতখাত করে। এতেও বেশ কিছু ভাইয়েরা পুনর্বার ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েন। ততদিনে দেশে কয়েকটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াতে এদেরকে দেশের বাইরে যাওয়া লাগে নি। এরা এগুলোতে তাদের শিক্ষা জীবন চালিয়ে গেছেন। তারপর এতগুলো বছর জাহাঙ্গীরনগর "মুসলিম" বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির গোপনে কাজ করেছে।
শিবির কখনো সেখানে নিষিদ্ধ ছিল না। কিন্তু ওপেনলি কাজ করতে গেলে সংঘর্ষে জড়াতে হত। সংঘর্ষ হলে শিবির ময়দানে টিকে যেত। কিন্তু পরে এসে সরকারী বাহিনী আবার তাদের উৎখাত করত। ফলে শিবির গোপনে কাজ করেছে। এখন যেহেতু সরকারী দমন-নিপীড়নের আপাতত কোন ভয় নাই তাই ওপেনলি কাজ করতেও কোন সমস্যা নেই।
=====
এই পোস্টের প্রথমাংশ ১৩ বছর পূর্বে সোনার বাংলা ব্লগে লিখেছিলাম, যা এখানে কিছুটা সম্পাদিত করে দিলাম প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায়। মন্তব্যের লিঙ্কে ব্লগ পোস্টটা পাবেন।
https://www.facebook.com/
549168136/posts/10160597027763137/?rdid=aBvr7Oqx7C7orfxK#
Comments
Post a Comment