শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও চট্টগ্রাম শিবিরের দায়

 ১৬ এ জুলাই সকালে মহানগর দক্ষিণ শিবিরের পরিকল্পনা সম্পাদক Tanvir Mostafa  ভাইয়ের ওয়ার্ড সভাপতি গ্রুপে ম্যাসেজ, বিকালে ষোলশহরে পোগ্রাম। (সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার হতো)  মহানগর দক্ষিণ ২নং গেইট থেকে মিছিল সহকারে যাবে ঠিক ৩.০০ টায়। দুপুর ১.০০ টায় ম্যাসেজ এলো ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা ষোলশহর দখল নিয়েছে সবাই যেন মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়। আমি বের হয়ে গেলাম যোহর সহ একবারে প্রস্তুতি নিয়ে। এরমধ্যে আবার ২.০০ টায় অনলাইনে শৃঙ্খলা বিভাগের জরুরী মিটিং ডাকলেন মহানগর দক্ষিণ সেক্রেটারি শাহরিয়ার ভাই। আমার স্মার্ট ফোন না থাকায় সার্কুলার দেখতে পেলাম না। আগ্রাবাদ এসে বন্ধু Md Tanjim  কে ফোন দিলাম কতদূর আসছে তখন তিনি আমাকে জরুরী মিটিং এর কথা বলেন। সবাই ৩.০০ টার পূর্বে ২ নং গেইটে যেন চলে আসে এবং মূল স্পটে অবস্থান না নিয়ে আশপাশে থাকে। পর্যাপ্ত ফাস্ট এইড ও ৩০০ জনের লাঠি থাকবে আমাদের। শাহাদাতের মানসিক প্রস্তুতি তখনই অটো সেট হয়ে যায় সবার। ঠিক ৩.০০ টায় আচমকা শুরু করবে। আমি যেহেতু আগেই বের হয়ে গেছি তাই ৩০ মিনিট পূর্বেই প্লেইস পৌঁছে যাই। নেমেই দেখলাম লীগের সন্ত্রাসীরা হকিস্টিক, লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আশপাশে অবস্থান নিয়ে ফেলছে। আমি রেললাইন ধরে হাটতে থাকলাম যেহেতু একা তাই হেটে হেটে সময় কাটাতে লাগলাম। রেল লাইনেও তাদের অবস্থান। এরপর  মসজিদ গলিতে Rahat Al Jubair  ভাইর বাসায় গেলাম এই অতিরিক্ত সময় কাটানোর জন্য। গিয়ে দেখি সবাই চিন্তা করতেছে কোত্থেকে শুরু করবে এই নির্দেশনা একটু পরপর পরিবর্তন হচ্ছে। এবার বললো মুরাদপুর চলে যেতে তখন সময় ২.৫৫ এর কাছাকাছি। তানজিম এসে পৌঁছালো। সে চাইলো  ২ নং গেইট থেকে রিকশা নিয়ে যাবে কিন্তু আমি বললাম বাসে যাবো নাহয় ষোলশহরে রিকশা থেকে আমাদেরকে নামিয়ে ফেলবে লীগ। ঠিক ৩.০০ টায় মুরাদপুর পৌঁছে গিয়ে দেখি আবার প্লেইস চেইঞ্জ কারণ দূর্ধর্ষ খুনি নূরুল আজিম রনি মুরাদপুর অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছে। এবার মতুন প্লেইস মুরাদপুর রেলবিট। 

মহানগর ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক @জাহেদুল ইসলাম জয় ভাই সহ অন্যরা আসলেন সাথে বেশকিছু সাধারণ শিক্ষার্থী ও জামেয়া সুন্নিয়ার একটা গ্রুপও আছে। এরমাঝে ম্যাসেজ আসে একটা সন্ত্রাসীও যেন হাত-পা সুস্থ নিয়ে যেতে না পারে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত এবং আমাদের রক্ত তখন টগবগ করছে। 

আমাদের লাঠি তখনো এসে পৌঁছেনি ২নং গেইট দিয়ে পার হতে না পারায়। হাতে কিছুই নেই, সবাই কিছুটা এলোমেলো। সবাই পাথর সংগ্রহ করে নিলাম। আমাদের ব্যাগে ৫ কেজির বেশি পাথর রেললাইন থেকে তুলে নিলাম। এরমাঝে হঠাৎ ছাত্রলীগ ধাওয়া দিল। সবাই আবার এলোমেলো। মিনিট কয়েক পরেই সবাই আবার সংগঠিত হলো এবং মিছিল শুরু হলো মুরাদপুরের দিকে রেলবিট থেকে। 

তখন ম্যাসেজ আসতেছে দুই নং গেইট আইইউসি ও অন্যদের উপর লীগ হামলা করতেছে।  আমাদের দৌড়ের উপর থাকা মিছিল মুরাদপুর পৌঁছাল এবং লীগ মুরাদপুর মোড় ছাড়তে বাধ্য হলো। তাদের মূল অংশ রাস্তার ওপারে হোটেল জামান এক্সক্লুসিভ এর সামনে। সবার আগে ফ্লাইওভারের নিছের  আইল্যান্ডে উঠেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের Shakhawat  ভাই। সন্ত্রাসীরা আমাদেরকে ভড়কে দিতে একেরপর এক ককটেল ফুটাতে থাকে৷ শুরু হয় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া।  মুরাদপুর - ষোলশহর রাস্তায় চলতে থাকে যুদ্ধ। 

এরমাঝে বাধাবিপত্তি মাড়িয়ে জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি স্কুল দক্ষিণ থানা সেক্রেটারি  Zayeed Bin Islam  রা ফাস্ট এইড এবং পতাকা সহ প্লাস্টিক পাইপ নিয়ে পৌঁছায়। তখন সময় ৩.৩০ আনুমানিক। 

লড়াই চলতে থাকে।  বুঝতে পারলাম ছাত্রদলের ভাইয়েরাও সেদিন আমাদের সাথে লড়াইয়ে আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাল একটা অংশ সম্মুখে ছিল। 

বিশেষ কৃতজ্ঞতা পাবে সেদিনের নারী শিক্ষার্থীরা যারা রেলবিট থেকে এই রণক্ষেত্র পর্যন্ত হাল না ছেড়ে ঠাঁই দাড়িয়ে ছিল। আমরা তখন বলাবলি করছিলাম তাদের সাহস নিয়ে। 

যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দ, একটু পরপর ককটেলের আওয়াজ ও আমাদের সম্মুখে থাকা সন্ত্রাসীদের অস্ত্র তাক করে গালিগালাজ এবং রাস্তায় রামদা শান দেওয়ার ভঙ্গি অনিশ্চিত সন্ধ্যা ডেকে ফিরছে তখন। তানভীর মোস্তফা ভাইকে বললাম আমরা তাদের এই ভারি অস্ত্রের সামনে দীর্ঘক্ষণ প্রতিরোধ করতে পারবো না। আমাদের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান নিয়ে সবাইকে বিশেষ করে মেয়েদের নিরাপদে স্থান ত্যাগ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শাহাদাতের ঘটনা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সময় ৪.৩০ এর একটু বেশি। 

একটু পরপর রক্তমাখা আহত ভাইয়েরা আসছে। তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে। ৫.০০ টার কাছাকাছি আমি আহত হই। মাথা ফেটে৷ যায় বন্ধু Abu Haider Simanto  প্রথম আমার কাঁধে হাত দেয়। এরপর ফার্মেসিতে রক্ত বন্ধ করে মেডিকেল চলে যাই। সেখানে গিয়ে মেডিকেল কর্মকর্তারা বলাবলি করছে মুরাদপুরে ২ জন মারা গেছে গুলি খেয়ে। 

আমাদের আতংক বেড়ে যায় আর ধারণা করি এই সংখ্যা আরো বেশি হবে। 

মাথায় সেলাই শেষে বাসায় যাওয়ার চিন্তা করতেছি এমন সময় মহানগর সভাপতির ম্যাসেজ সবাই যেন এখন স্থান ত্যাগ করে কারণ পরিস্থিতি জঘন্য ভয়াবহ এবং সবাইকে সবার খোঁজ খবর রাখতে বলেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদে বের হতে পারেন সেদিকেও সবার নজর ছিল। 

সন্ধ্যা শেষে গ্রুপে ম্যাসেজ আসতে শুরু হলো অমুক ভাইকে পাওয়া যাচ্ছে না তমুক ভাইকে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও সিএনজি থেকে নামিয়ে নির্মম নির্যাতন করছে এসব খবরে চারদিকে উত্তেজনা বেড়ে গেল। 

রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বের হওয়া উচিত হবে না বলে তানজিম তার বাসায় থেকে যেতে বললো। বাসায় ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে সাহস করে সিএনজি নিয়ে সরাসরি ফ্লাইওভার দিয়ে লালখান বাজার হয়ে বাসায় পৌঁছে দেখি মহানগর সভাপতির ম্যাসেজ। 

"আলহামদুলিল্লাহ আমাদের ভাই ফয়সাল আহমেদ শান্ত শহীদ হয়েছেন"।  আলহামদুলিল্লাহ পড়ছেন কেও এবং কেও ইন্না-লিল্লাহ পড়ছেন। যেন এক অনাবিল  আনন্দ বয়ে চলছে শাহাদাতের সম্মানের যার ভেতরে ভাই হারানোর তীব্র শোক ও যন্ত্রণা। কান্নাকাটি ও শোকে শরীর অসাড় হয়ে থমকে গেল সবার চঞ্চলতা। স্কুল দক্ষিণ থানার ওয়ার্ড সভাপতি ফয়সাল আহমেদ শান্ত এখন মহানগর দক্ষিণ ময়দানের ৪র্থ শহীদ। 

জয় ভাই ও Mohammad Akif Ibn Yousuf  ভাই মেডিকেলে তখন শান্ত ভাইর ছবি পাঠালো। নিথর দেহ স্ট্রেচারে শুয়ে আছে। আমাদের শোক যন্ত্রণা আরো তীব্র হয়ে গেল। সবাই সবাইকে ফোন দিচ্ছে আর আহাজারি করছে। আমাদের সবার প্রতিক্ষা এবার ভাইয়ের জানাজার অপেক্ষা। কারো মুখে খাবার উঠছে না। একটু পরপর একজন অন্যজনকে ফোন দিচ্ছে, ম্যাসেজ দিচ্ছে। সবকিছুই অনিশ্চিত। 

রাত ৩.৪০ নাগাদ ঘুমাতে গেলাম। মাথা রাখতেই মনে পড়লো আমাদের ভাই এখনো মর্গে আমি কিভাবে ঘুমাতে পারি। উঠে গেলাম এবং শেষ রাতে ম্যাসেজ এলো ভাইয়ের লাশ এখানে হস্তান্তর করছে না। পুলিশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে। হতাশা তীব্র হয়ে গেল সবার। শহীদের সাথে থাকা মহানগর ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক জয় ভাই ও পতেঙ্গা থানা সভাপতি আকিফ কে পুলিশ মর্গের বাহির থেকে আটক করে নিয়ে যায় গোপন স্থানে। 

পরদিন মহানগর সভাপতি Md Shahidul Islam  ভাই জানাজা পড়ে এবং আমাদের ভাইকে কবরে রেখে এলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাতারে। যে জুলুমের মোকাবিলায়  মজলুমের মুক্তি নিশ্চিত করতে নিজেকে শাহাদাতের মনজিলে সোপর্দ করলেন৷ 

জুলাই বিপ্লব এই পবিত্র রক্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সর্বশেষ ৩৬ এ জুলাই ফ্যাসিবাদের পতনের মাধ্যমে জাতির মুক্তির বন্দোবস্ত করেই সমাপ্তি টানলো। 

কিন্তু জুলাইয়ের প্রথম কাতারের শহীদ 'শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত' কে  শিবির আরেকবার কুরবানি করলো একটি জাতিয় ঐক্যের জন্য। যেখানে সকল শহীদ সমান মর্যদা ও গুরুত্ব পাবে কারো রাজনৈতিক বা বিশেষ পরিচয়ের জন্য না। সকল শহীদকেই এই জাতির শহীদ এবং সবাই আমাদের এবং সকলের শহীদ এই চিন্তায় যেন জাতীয় ঐক্যের ভিত গড়ে উঠে। এই ধারণা আর গড়ে উঠেনি বিশেষ একটি গোষ্ঠীর অদূরদর্শিতা ও সার্থপরতার জন্য। 

শহীদ শান্তকে নিয়ে বানানো ডকুমেন্টারি শিবির তার নিজের পরিমন্ডল ছাড়া বাইরে প্রচার করলো না। শান্ত যেন কোন দলের শহীদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হয়। সকল শহীদ যেন বাংলাদেশের সকলের শহীদ হিসেবে মর্যদা পায়। অমুসলিম শহীদ হৃদয় তরুয়াকে শিবির নিজেদের প্যাডে শহীদ হিসেবে সম্বোধন করে বিবৃতি দেয় শুধু জুলাইয়ের পবিত্রতার স্পিরিট থেকে। ইতিপূর্বে কোন ইসলামী সংগঠন অমুসলিমদের এভাবে সম্বোধন করেছে কি না তা জানা নেই। 

সর্বশেষ শিবির জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিতে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে সেখানে মুগ্ধ ওয়াসিমদের নাম উচ্চারণ হয় ৩ বারের অধিক এবং তার নিজের জনশক্তি শান্তর নাম উচ্চারণ করে মাত্র এক বার৷ 

জুলাইয়ের শহীদেরা আমাদের জাতীয় জীবনে ঐক্যের প্রতিক হোক এবং এই গণহত্যার উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে আমাদের দায় মুছুক। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।


https://www.facebook.com/
story.php?story_fbid=1434778107499289&id=100029013395726&rdid=DO8FO3DxK3omf1IG

Comments