জুলাই - ঐতিহাসিক দিন গুলো
১ম কিস্তির পর: সাদিক ভাই যখন কল দিলেন মনে হইলো পুরাই পাগলপারা! ১৫ তারিখের হামলা দেইখা প্রায় ট্রমাটাইজড। তখন আফসোস করলেন— গতকাল সাহস করে দুই তিনজন সামনে দাঁড়াইলেই হইতো, আপুদের রাইখা দৌড়াইয়া জান বাঁচানো ঠিক হয় নাই। যাইহোক, ফোনকলে এটাই বুঝাইলেন— আমাদেরকে যেভাবেই হোক শহীদ মিনারে দাঁড়াইয়া থাকতে হবে ১৬ তারিখ। কিছুতেই যেন হাল না ছাড়ি। ছাত্রলীগ যুবলীগ যেই আসুক না কেন যেন প্রতিরোধ গইড়া তুলি শক্তভাবে। সাহস দিলেন— কইলেন লজিস্টিক সাপোর্ট কিংবা জনশক্তির ব্যপারে যেন চিন্তা না করি। কিন্তু সামনের সারিতে বা আক্রমণ আসলে প্রথম নেতৃত্ব যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই থাকে। গতকালের মতো যেন দৌড় না দিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না করি। উল্লেখ্য প্রথম সারির একজন সমন্বয়ক প্রাণভয়ে রেজিস্ট্রার ভবনের ওয়াশরুমে নিরাপত্তা নেন ১৫ জুলাই।
বাসা থেকে যোহর নামাজ আদায় করলাম। দুই রাকাত নফলও। আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম যেন বিপদ আসলে সবাই ফেলে দিয়ে চইলা গেলেও আল্লাহ যেন আমার ব্যাকআপ হয়ে দাঁড়ায়। আয়াতুল কুরসি পইড়া রওয়ানা দেই শহীদ মিনারের উদ্দেশ্য। আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাগের ভিতর হার্ড কাভারের বই, একটা গামছা ও টুথপেষ্ট নিতে ভুল করি নাই।
যদিও টিএসসি রিস্ক জোন ছিলো, মেট্রো করে টিএসসিতেই নামি। আবার মুনেম ভাইয়ের ফোন, লোকেশন ও পরিস্থিতির আপডেট নিলো। হাঁটতে হাঁটতে শহীদ মিনারের দিকে যাই দোয়েল চত্বর হয়ে। পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের সামনের রাস্তাটা এড়িয়ে যাই কেননা ছাত্রলীগের অবস্থান। যেহেতু আমি চিহ্নিত ও পূর্ব থেকে তাদের আক্রোশ— নিরাপত্তার খাতিরেই পিছন দিক দিয়ে গমন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। বড় কোনো উপস্থিতি চোখে পড়লো না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে সাধারণত যেমন থাকে এমনই। হতাশ হইলাম। পরিচিত আশেপাশে কাউকে খুঁজে পাইলাম না। কিছুক্ষণ পর দেখি এবি যোবাইর, মোসাদ্দিক, রাফি ব্যান্ডেজসহই এদিকে আসছে। সাহস পাইলাম। একটা হ্যান্ড মাইক আর সরাঞ্জামাদি ছিলো ব্যাগে। তারপর আমার ডেপ্টের বন্ধু মুনেম, তাজওয়ার, রাফি, সামি, অরিত্রকে দেখি। এত্তো ভাল্লগছিলো! কিছুক্ষণ পর অপরিচিত এক ভাই আমাকে চিনেন, এসে আইন অনুষদের ভিতরে লুকিয়ে রাখা কিছু ডাল, লাঠি, পাইপের সন্ধান দিলেন। কয়েকজন মিলে বস্তাভর্তি করি। সবচেয়ে আশা ও ভালোলাগার বিষয় ছিলো আইন অনুষদ আর ঢাবি মেডিকেল সেন্টারের কর্মচারীরা আমাদের লাঠি, বাঁশ, কাঠের টুকরা সংগ্রহ করে দেন— সাথে সাথে অনুপ্রেরণামূলক বাক্যও বলেন। অন্তর থাইকা সাহস ও শক্তি পাইলাম।
ইতোমধ্যে ঘোষিত প্রোগ্রামের টাইম হইয়া গেছে। অথচ জমায়েত কেও হয় নাই। কোনো মিছিল আসে নাই। কিছুটা নিরুৎসাহিত। তারপর আসিফ ভাইকে কল দিলাম, কইলেন ওনারা শহিদুল্লাহ হলের কর্নারে আছেন। লোকজন জড়ো হচ্ছেন। মোসাদ্দিক, যুবাইরসহ আরো কয়েকজন ইতোমধ্যে স্লোগান শুরু করে দিলো। সাথেসাথে কোত্থেকে শতশত মানুষ চলে আসলো! তারপরও পর্যাপ্ত লোকবল মনে হইলো না। তারপর দেখি পলাশি থেকে বড়সড় চার-পাঁচটা মিছিল আসছে। ওনাদের কাওকেই ঢাবিয়ান মনে হয়নি। মাদ্রাসার স্টুডেন্ট অনেককেই দেখলাম। এবার লোকে লোকারণ্য শহীদ মিনার। অবশেষে মহসিন হল, সূর্যসেন হলো, জহু হলের শিক্ষার্থীরাও লাঠিসোঁটা নিয়ে হাজির। সবার হাতে হাতে পাইপ, স্ট্যাপ পৌঁছে গেলো কিন্তু কোত্থেকে আসলো বুঝে উঠতে পারি নাই!
এইদিন সবচেয়ে আশার বিষয় ছিলো যাদেরকে এতোদিন এপোলিটিক্যাল জীব, ফুল-পাখি-লতা-পাতা বলে ব্যাঙ্গ করতাম তারাও দেখি লাঠি হাতে নিছে। নিজের কাছে নিজে মাফ চাইলাম। শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশগ্রহণ বড় একটা পাওনা ছিলো।
আমরা চারদিকের রাস্তার প্রবেশমুখে ইটের টুকরা জমা করি আত্মরক্ষার্থে। একটা ভ্যান চালক নিজ দায়িত্ব নিয়া বলতাছে বড় টুকরাগুলা ভড়েন, ওনি নিজেও ভ্যানে তুলে আগায় দিলেন। ভাড়া নিলেন না। এতো উদ্দাম আগে দেখি নাই।
ভাবছিলাম লীগ এসে আক্রমণ করবে, কিন্তু এতো জমায়েত আর মানসিক প্রস্তুতি দেইখা আগায় নাই। শহীদ মিনারের রোড দিয়ে একটা বাস যায়— টোকাইভর্তি। সাথে সাথে উত্তেজিত জনতা গ্লাসগুলা ভেঙ্গে দেয়। ঐদিকে রেজাউল করিম শাকিল ভাই, আসিফ আব্দুল্লাহ ভাইরা কার্জন হলের ঐ দিকটায় হাজী সেলিমের কুত্তাদের সামলাইয়া শহীদ মিনার সেইফ রাখতেছে। ছোটভাই অয়নের পা গু*লিবদ্ধ হয়। খুবই খারাপ লাগছে শুনে! এই ছেলেটা গিটার বাজাইতে পারতো ভালো।
সর্বশেষ মুহূর্তে আসিফ ভাই, নাহিদ ভাই, হাসনাত ভাই, মাসুদরা আসলেন। বক্তব্য দিলেন। আমাদের মানসিক প্রস্তুতি ছিলো আমরা রাজুতে যাবো, গিয়ে সাদ্দামকে উত্তমমধ্যম বা দৌড়ানি দিয়ে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। ইতোমধ্যে আবু সাঈদ, ওয়াসীম, শান্তর শাহাদাতের খবর পেয়ে বুকে ঝড় বইতেছিলো। একটা ভ্যান যায় আমাদের সামনে দিয়া, রক্তমাখা। সাইন্সল্যাবে আহত আন্দোলনকারী৷ তারউপর গতকালকের হামলার ভয়াবহ পরিস্থিতি। নিজের আক্ষেপ ও ক্ষোভ মিটানোর জন্য সাদ্দামের পিঠ খুব প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু ঝামেলা বাঁধে যখন সমন্বয়করা দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে টিএসসিতে মিছিল নিয়ে যাওয়া নিয়ে। নিজেদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয় কিছুক্ষণ। আন্দোলনকারীরা চাচ্ছে টিএসসিতেই যেতে কিন্তু সার্জিস ভাই, বাকের ভাই খুব সম্ভব যেতে চাচ্ছিলেন না। ক্ল্যাশ এড়িয়ে যাওয়াটাই উদ্দেশ্য। সবশেষে মিছিল দোয়েল চত্বর থেকে মেডিকেলের পিছন দিক ঘুরে শহীদ মিনারে আসে। এখানে এসে আরেকদফা বাকবিতণ্ডা! কেন ছাত্রদের পালসের মূল্যায়ন করা হইলো না। বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেকেই চলে আসে। বলে রাখা ভালো, এখানে বুয়েট যুক্ত হয়। তাদের মোটামুটি বিশাল লোকবল নিয়েই আসে। এইজন্য মিছিল বের করতেও কিছুটা সময় নেয়।
আমিও আসিফ ভাই, বাকের, নাহিদ ভাইকে পীড়াপীড়ি করছিলাম টিএসসি বা ক্যাম্পাসের ভিসি চত্বর যেতে। কেননা হল থেকে যারা আসছে তারা মিছিল ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে গেলে ছাত্রলীগ একা পেয়ে আরো জঘন্য নির্যাতন করতে পারে। যেহেতু মিছিল নিয়ে যাওয়া আর হইলো না তাই মন খারাপ হয়। অনেকেই একে একে চলে আসে। আমিও টিএসসি থেকে মেট্রো করে চলে আসি বাসায়। সন্ধ্যা হলো, মাগরিবের আজানের পর দিনের আলোর মতো মিলিয়ে গেলাম মধ্যবিত্ত জীবনের টিউশনে।
কিন্তু শেষপর্যন্ত রাতে অনেক খুশি ও অখুশির খবর পাই। মিছিল নিয়ে ঠিকই যাওয়া হয়…
(To be continued…)
https://www.facebook.com/
100071961430019/posts/590277153380994/?rdid=UnUWQayYMDBLyPFP#
Comments
Post a Comment